উদ্যোমী এক বাংলাদেশি ইঞ্জিনিয়ারের প্রবাস জীবন, পর্ব- ০২ ।

মেয়েটার নাম সারা, বয়স ২৪-২৫ হবে, দেখতে খুবই সুন্দর, গায়ের রং একদম দুধে আলতা যাকে বলে। আমি সাধারণত মেয়েদের দিকে ভালোভাবে তাকাইনা কিন্তু সারাকে দেখে আমার দৃষ্টি যেন সরানো কঠিন। হাতে দামী একটা ব্রান্ডের ঘড়ি, গলায় একটা হোয়াইট গোল্ডের চেইন ও সুন্দর একটা হীরার লকেট কিন্তু নাক আর কান খালি। যদিও চাইনিজরা নাকফুল পরেনা, তার পরও খেয়াল করলাম দুই হাতের এক হাতেও কোনো আংটি নেই, মানে এখনো বিয়ে করেনি স’ম্ভবত।

পায়ের সেন্ডেল দেখেই বুঝাযায় সে ডিজাইনের চেয়ে স্বা’চ্ছন্দ বেশি পছন্দ করে। সারা আমার দিকে এগিয়ে এসে আমাকে জি’জ্ঞাসা করলো, তুমি কি নাজমুল? আমি বললাম হ্যা, সে বললো আমি তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। চলো আমি তোমাকে আমাদের ডাটা সেন্টার বেসমেন্ট-৩ এ নিয়ে যাই। সে আমাকে দেখেই চিনতে পেরেছে, কারণ আমি (Sun Microsystem) এর টি-শার্ট পরা ছিলাম।

প্রথম পর্বে যেমনটা বলেছিলাম, তখন আমি সান মাইক্রোসিস্টেম এর সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কাজ করতাম এবং প্রতিদিন ২-৩ কাস্টমার সাইটে সাপোর্ট দিতে যেতাম। সারাদের একটা সা’র্ভারে স’মস্যা হওয়াতে আমাকে পা’ঠানো হইয়েছে, স’মস্যাটা স’মাধান করতে। সিঙ্গাপুরে অরচা’র্ড রোডের পাশে সমারসেটে কম সেন্টার নামে (SingTel) এর একটা বিল্ডিং আছে তারই আন্ডার গ্রাউন্ড বেসমেন্ট-৩ এ ওদের ডাটা সেন্টার।

লেভেল ১ এ সিকিউরিটি অফিস থেকে পাস কালেক্ট করে আমরা চলে গেলাম (B-3) ডাটা সেন্টারে। সারা বলছিলো কাল রাতে ইন্টেলিজেন্ট নেটওয়ার্ক সা’র্ভার এ কাজ করছিলাম, হঠাৎ দেখি সা’র্ভার খুব স্লো। ভালো করে চেক করার পর বুঝতে পারলাম হাফ অফ সা’র্ভার মেমোরি ডিসএপেয়ার হয়ে গেছে। পরে লগ ফাইল চেক করে বুঝতে পারলাম, সা’র্ভার এর একটা মা’দার বোর্ড এ স’মস্যা হচ্ছে।

আমি বেশ অবাক হলাম। এক, মেয়েটা অনেক সুন্দর, আর দুই, মেয়েরা সাধারণত (Unix) নিয়ে কাজ করেনা। (Unix) হচ্ছে একটা ক’মপ্লে’ক্স অপারেটিং সিস্টেম, এখানে কাজ করলে ব্যাকএ’ন্ডে কি হচ্ছে তার অনেক কিছু মনে রাখতে হয়। যেমন বুট প্র’সেস, স্টা’র্টআপ স্ক্রি’প্ট, আরসি স্ক্রি’প্ট, কা’র্নেল ইত্যাদি। আমার অ’ভিজ্ঞতায় দেখেছি, মেয়েরা সাধারণত ক’র্ম ক্ষে’ত্রে সহজ কা’জটা’ই বেছে নেয়।

সারা বললো, ডাউন টাইম সকাল ১০টা থেকে ২টা পর্যন্ত, এখনো ২০মিনিট বাকি আছে, তাই সা’র্ভারে কিছু করতে মানা করলো। যেহেতু কিছুটা সময় হাতে পেলাম আর তাই কৌতূহল নিয়ে সারাকে জি’জ্ঞাসা করলাম, তুমি ইউনিকস নিয়ে কেন কাজ করতে আসলে, আরো তো অনেক জব ছিলো? সারা বললো, সে তার মা-বাবার একমাত্র স’ন্তান। তার বাবা একটি ব্যাংকের ভিপি আর মা ডাক্তার। মা-বাবাকে দেখে তার ইচ্ছে ছিলো অন্য কিছু করবে,

আর তাই টেলিকমিউনিকেশন নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে (SingTel) এ জব নিয়েছে। সান সোলারিস এ ট্রেনিং করার পর তার টীমে সেই একমাত্র মেয়ে (Unix) নিয়ে কাজ করে। কাজটাকে সে এডভে’ঞ্চার হিসাবে নিয়েছে। সময়টা ছিলো শনিবার সকাল। সারা জি’জ্ঞাসা করলো, তুমি মুসলিম? আমি বললাম হ্যাঁ। সে বললো, তাহলে তো তোমার এই সময় হোম টাউনে থাকার কথা, কারণ আজ শনিবার, কাল রবিবার আর সোমবারে হারি রায়া (ঈদ)।

তার মানে তিনদিন ছুটি, এটা লং উইকেন্ড। তোমার তো দেশে যাওয়া উচিত। আমি হেসে বললাম, সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশ ৪ ঘণ্টা সময়ের দূর’ত্ব, আমি চাইলে যেকোন সময় যেতে পারি। আমি সার্ভিস রিপো’র্ট হাতে নিয়ে লিখতে শুরু করলাম। আমার সহক’র্মীরা সার্ভিস রিপো’র্ট লিখে কাজ শেষে, কিন্তু আমি কাজ শুরু করার আগেই বেসিক ইনফরমেশন লিখে ফেলি। সারা আমার কাছে এসে বললো, তোমার কলমটা খুব সুন্দর।

আমার কাছে সান মাইক্রোসিস্টেম এর স্টেইনলেস একটা সুন্দর রেয়ার কলম ছিল। সারা বলা মাত্র আমি কলমটা ওকে দিয়ে দিলাম বললাম, এটা তুমি নাও, আমার এমন কলম বেশ কয়েকটা আছে। অথচ ওটাই ছিলো আমার একমাত্র শখের কলম। ওর মতো সুন্দর একটা মেয়েকে শখের একটি গিফট দিতে পেরে নিজেকে নিয়ে একটু গর্ববো’ধ করছিলাম।

সারা আমাকে সব স’মস্যার বর্ণনা দিয়ে জি’জ্ঞাসা করলো, তোমার কাজ শেষ হতে কতক্ষ’ণ লাগবে? আমি বললাম, ২-৩ ঘণ্টা। সে সা’র্ভার এর অ্যাডমিন পাসওয়ার্ড আমার হা’তে দিয়ে বললো, আমি তিন ঘণ্টার জন্য বাইরে যাবো। আমার বয়ফ্রে’ন্ড এর সাথে লা’ঞ্চ করবো। আমি হেসে বললাম, কোনো সমস্যা নেই, আমি এর ম’ধ্যে কাজ শেষ করে ফেলবো।

সারা চলে যেতেই কেন যেন নিজেকে একটু অ’সহায় লাগলো, আবার এত বড় ডাটা সেন্টার আমি ছাড়া কোনো প্রাণী নেই আর, তাই ভয়টা একটু বেশি। কিন্তু যেহেতু আমি এরকম আরো অনেকবার একা একা ডাটা সেন্টারে কাজ করেছি তাই নিজেকে অভ’য় দিয়ে কাজে ম’নোযোগ দিলাম। আমি যে সা’র্ভারে কাজ করতে এসেছি তার একজোড়া সার্ভার এর লিস্ট প্রাইস ছিলো ৪ কোটি টাকা।

তাই ভ’য়টা একটু বেশি যদি এদিক থেকে ওদিক করে ফেলি তার উপর এটা ছিলো লাইভ প্রোডাকশন সা’র্ভার এবং আমি একা। যাই হোক, দেড় থকে দুই ঘণ্টার ম’ধ্যে আমি সান ৬৪০০ সার্ভার এর মাদার বোর্ড চে’ঞ্জ করে রি’সোর্স সব এনাবল করে দিলাম। যেহেতু এই সা’র্ভারে এরিক্সসন এপ্লি’কেশন রান করছিলো, আর আমি ঢাকায় গ্রামীণ ফোন ও একটেল এর বেশ কয়েকটা সার্ভার এর এরিকসন এপ্লিকেশন নিয়ে কাজ করেছি।

এরিকসন ঢাকায় মাহফুজ ভাই এর কাছে থেকে কিছু নি’র্দেশনা শি’খেছিলাম, সেগুলো দিয়ে সিস্টেমও এপ্লি’কেশন এর হেলথ চেক করছিলাম। এদিকে দুপুর পে’রিয়ে বিকেল ৩টা বেজে গেছে। সারার কোনো খবর নেই। হ’ঠাৎ ভাবলাম একটা মেসেজ দিব তার ক’তক্ষ’ণ লাগবে জানতে। মোবাইলের দিকে তা’কিয়ে দেখি কোনো সিগন্যাল নেই, মোবাইল কাভারেজ জিরো। আজব বেপার হচ্ছে, আমি (SingTel) লাইন ই’উস করি আর এই ডাটা সেন্টার এ তাদের কা’ভারেজ নেই।

এবার আমি একটু ভয়ও পেয়ে থাকলাম। সকালে ব্রেকফা’স্ট করিনি, ভেবেছিলাম কাজটা শেষ করে একবারে লা’ঞ্চ এ যাবো। আসেপা’শে খুঁ’জে একটা ল্যান্ড ফোন খুঁ’জে পেলাম কিন্তু সেটাও কাজ করে না। হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ৫টা বেজে গেছে কিন্তু সারার কোনো খবর নেই। আ’শেপা’শে ঘু’রাঘু’রি করে ডা’কছিলাম ‘এনি বডি হেয়ার? এনি ওয়ান ক্যান হে’ল্প প্লিজ’ কিন্তু কাঁ’চে ঘেরা ডাটা সেন্টারে আমার কথা কোথাও গে’ল বলে মনে হলনা। অনেকক্ষ’ণ পর অনেক দূরে একটা (CCTV) দেখে অনেকক্ষ’ণ ডা’কাডা’কি করছিলাম,

কিন্তু কোনো লা’ভ হলো না। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ৭টা বাজে। ক্ষু’ধায় আমার না’ড়িভু’রি সব হজম হয়ে যাবার উপক্র’ম। ব্রেকফা’স্ট, লা’ঞ্চ ও ডিনার কোনোটাই করিনি। সব চেয়ে বড় ভয় ঈদের জন্য আ’গামী তিনদিন সিঙ্গাপুরে অফিস-আদালত সব ব’ন্ধ। বার বার মনে হচ্ছে, আমি এখানে আগামী তিনদিন না খেয়ে মা’রা যাবো। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ৮টা বেজে গেছে। এবার বুঝতে পারলাম একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আমাকে কেউ র’ক্ষা করতে পারবে না। সা’র্ভার র্রেক এর সামনে বসে মনে মনে আল্লাহকে ডাকছিলাম আর দোয়া পড়ছিলাম | তার অনেক পরে হঠাৎ…(চলবে)