প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভালোবাসা কি এবার নিলামে উঠবে?

এই করো'নাভাইরাসের নানা খবরের মধ্যে দুটি খবর আমাকে নাড়া দিয়েছে। এর একটি হচ্ছে-প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষের কানাডায় সে দেশের সরকার ৩ কোটি ৭০ লাখ সিরিঞ্জ সরবরাহের জন্য একটা কোম্পানিকে ক্রয়াদেশ দিয়েছে। তাদের লক্ষ্য হচ্ছে করো'নার ভ্যাকসিন আবি'ষ্কার হওয়ার পরে তাঁরা দেশের সব মানুষকে করো'না ভাইরাসের ভ্যাক্সিনের আওতায় আনতে চান।

এটি একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা যাতে দেশের মানুষের প্রতি সরকারের গভীর ভালোবাসার আর দায়িত্ববোধের প্রকাশ পেয়েছে। অ’পরটি হচ্ছে বাংলাদেশর প্রধানমন্ত্রী সারা দেশের সব উপজে'লা হাসপাতালে ইন্টেন্সিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) স্থাপনের জন্য বাজেট বরাদ্দ করেছে। সেটা ছিল ১৯৭৭ সাল। জাপানী সহায়তায় বাংলাদেশের ইন্সটিটিউট অফ কার্ডিওভ্যাস্কুলার ডিজিজ (আইসিভিডি) এ কার্ডিওভ্যাস্কুলার ডিজিজ কন্ট্রোলের একটা কারিগরি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। সোহরাওয়ার্দি হাসপাতালে কিছু অংশ নিয়ে এই প্রকল্প চালু করা হয়। এই প্রকল্পের তিনটি কম্পোনেন্ট ছিল- জাপানিজ বিশেষজ্ঞ, যন্ত্রপাতি আর জাপানে বা অন্য কোন দেশ যারা কার্ডিওভ্যাস্কুলার ডিজিজ কন্ট্রোলে খুব ভালো সেখান থেকে বাংলাদেশি ডাক্তার,

টেকনিশিয়ান ও নার্সদের প্র'শিক্ষণ দেওয়া যায়। বর্তমানে ৯১ বছর বয়সী আমা'দের জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার (অব:) এম এ মালিক তখন আইপিজিএমআর এ বা পিজি তে কাজ করেন। তাঁকে ১৯৭৮ সালে জাইকার এই গু'রুত্বপূর্ণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক করা হলো। এই প্রকল্প চলে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত। এর পরে বাত জ্বর ও বাত-জ্বর জনিত হৃদ রোগ হাসপাতাল করা হয় জাপানী সাহায্যে। ১৯৮৮ সালে শুরু হয়ে শেষ হয় ১৯৯৬ সালে। এখানে গ্রান্ট ও কারিগরি সহায়তা দুটিই ছিল। জাপানী গ্রান্ট দিয়ে বিল্ডিং করা হয় সোহরাওয়ার্দি হাসপাতালের দক্ষিণ পাশে। তখন বাংলাদেশের কোন হাসপাতালে আইসিইউ বা করো'নারী কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) ছিল না। ছিল না সেখানে কাজ করার মত দক্ষ নার্স।

আইসিভিডি’র এই প্রকল্পের মাধ্যমেই জানা যায় যে, বাংলাদেশে কোন হাসপাতালে আইসিইউ আর সিসিইউ কত জরুরী। সারা জীবন হৃদরোগ নিয়ে কাজ করা ব্রিগেডিয়ার (অব:) এম এ মালিক সাহেব সরকারের নীতি নির্ধারকদের মন গলাতে পারেন নি। তবে তিনি বেশ কিছু ডাক্তার টেকনিশিয়ান ও নার্সদের আইসিইউ ও সিসিইউতে কাজ করা যোগ্য করতে জাপান থেকে প্র'শিক্ষণ দিয়ে নিয়ে আসেন। নার্সদের প্র'শিক্ষণ ছিল ১০ মাসের, এটা ছিল খুব গু'রুত্বপূর্ণ। কারণ আইসিইউ বা সিসিইউতে একজন করে ডাক্তার সব সময় বসে থাকতে পারেন না, তাঁর জন্য লাগে সেখানে কাজ করার উপযোগী দক্ষ নার্স।

যে সব ডাক্তারগন জাপান থেকে প্র'শিক্ষণ নিয়ে আসেন তাঁরা একটু উচ্চপদে আসীন হবার পরে আইসিইউ বা সিসিইউ করার জন্য চাপ দেওয়া আর কিছু সরকারী কর্তাদের হৃদ রোগ হবার পরে বড় সাহেবদের মন গলে। স্বাস্থ্য খাতের নীতিনির্ধারকদের তাই সারা দেশের হাসপাতালে আইসিইউ বা সিসিইউ তৈরি করতে অনেক সময় লেগে যায়। এবার আসি আসল কোথায়। অবকাঠামোগত উন্নয়নে সরকারী কর্তাব্যক্তিদের অনেকেই খুব আগ্রহী কারণ তাতে কেনাকা'টার মত পুকুর চুরির সুযোগ অনেক বেশি। কিন্তু আইসিইউ বা সিসিইউ চালানোর মত দক্ষ নার্স কি আমা'দের দেশে আছে? নার্সিং ট্রেনিং ইস্টিটিউটএর কারিকুলাম কি আপডেট করা হয়েছে? হলেও তা কতোখানি হয়েছে তাঁর খবর কি স্বাস্থ্য খাতের নীতিনির্ধারকদের কাছে আছে?

আইসিইউ বা সিসিইউ চালানোর জন্য যে সব যন্ত্রপাতি লাগে তা চালানোর মত দক্ষ জনশক্তি কি আম'দের আছে, নাকি তা তৈরির জন্য কোন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে? তা না হলে আইসিইউ বা সিসিইউ আর সাধারণ কেবিনের মধ্যে কি কোন পার্থক্য থাকবে? অনেক হাসপাতালে দেখা গেছে যে, যন্ত্রপাতি কেনার কয়েক বছর পরেও তার ন্যূন্যতম ব্যবহার হয়নি, অনেক যন্ত্রের প্যাকেট খোলা হয়নি। এমন ঘটনাও ঘটেছে যে, হাসপাতালের ওয়ারিং আছে টু পিন সকে'টের আর যন্ত্রের কানেকশন লাগে থ্রি পিন সকে'টে। একটা সকেট চেঞ্জ না হওয়াতে ঐ যন্ত্রের ব্যবহার হয়নি অনেক বছর।

ইতোমধ্যে যন্ত্রের আয়ু শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের নামে লোপাট হয়েছে কোটি কোটি টাকা। কোন শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠায় যেমন ব্যাক-ওয়ার্ড আর ফরোয়ার্ড লিংকেজ কোম্পানি থাকে তেমনি সব খাতেই এমন কিছু বি'ষয় থাকে তা না চিন্তা করে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন কতখানি কাজে দেবে? সেটি পরে হবে একেকটা শ্বেতহস্তী, সরকারের মানে জনগণের টাকার তসরুপ হবে দেদারসে। দেশের গরীব আর অসহায় জনগণের চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করার প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ভালবাসাকে যেন নিলামে বা টেন্ডারে বিক্রি না করা হয় সেটা কে দেখবেন!