কিছু কিছু এলাকা শাটডাউন করে দেওয়া হতে পারে: ওবায়দুল কাদের

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘করোনা ভাইরাসের কারণে পরিস্থিতি বুঝে কিছু কিছু এলাকা শাটডাউন করে দেওয়া হতে পারে। এছাড়া প্রয়োজন হলে আন্তঃজেলা বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।’ বুধবার (১৮ মার্চ) সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আলোচনার সময় তিনি এসব কথা বলেন। ওবায়দুল কাদের বলেন,

‘করোনা আমাদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। এ ধরনের সমস্যা ফেস করার মতো অভিজ্ঞতা আমাদের আগে ছিল না। এটিকে কাজে লাগিয়ে আমরা করোনা মোকাবিলা করছি। করোনা আমাদের জাতীয় শত্রু। তাই দলমত নির্বিশেষে সবাইকে মিলে এর মোকাবিলা করতে হবে। এজন্য সবাইকে এগিয়ে আসা প্রয়োজন।’বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও স্থানীয়ভাবে ছড়াতে শুরু করেছে নতুন করোনাভাইরাস। এ পর্যন্ত মোট আক্রান্ত হয়েছে ১৪ জন। এর মধ্যে চারজনই স্থানীয়ভাবে সংক্রমিত। নতুন আক্রান্ত তিনজনের দু’জনই শিশু। যাদের বয়স ১০ বছরের নিচে। আক্রান্ত ৮ জনের মধ্যে তিনজন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এছাড়া আইসোলেশনে আছেন সন্দেহজনক আরও ১০ জন। সারা দেশে কোয়ারেন্টিনে আছেন ৩ হাজার ৪৮৮ জন।

রোববার এই সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৭১ জন। এক দিনের ব্যবধানে কোয়ারেন্টিনে থাকা সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ১ হাজার ১৭ জন। সর্বোচ্চ সংখ্যক কোয়ারেন্টিনে আছেন চট্টগ্রাম বিভগে ১ হাজার ৩৪৩ জন। সবচেয়ে বেশি কোয়ারেন্টিনে থাকা জেলা মানিকগঞ্জ। সেখানে ২৯৬ জন কোয়ারেন্টিনে। যে এলাকগুলোয় স্থানীয় সংক্রমণ ঘটছে, সেই এলাকা লকডাউনের কথা ভাবছে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার।

এদিকে সোমবার সন্ধ্যায় কাতার এয়ারওয়েজের একটি বিমানে করে ৬৮ জন ইতালির যাত্রীসহ ৯২ জন দেশে ফেরেন। বিমানবন্দর থেকে তাদের আশকোনার হজক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে আরও তিনজনের মধ্যে নতুন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। যারা এর আগে আক্রান্ত এক প্রবাসীর পরিবারের সদস্য।

সোমবার করোনা সংক্রান্ত নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানিয়ে তিনি বলেন, নতুন আক্রান্তদের মধ্যে দু’জন শিশু। এ তিনজনের একজন ২৫ বছর বয়সী নারী, একজন ছয় বছর বয়সী মেয়ে এবং একজন দুই বছর বয়সী ছেলেশিশু। দুই শিশুর জ্বর-সর্দি, কাশির সুস্পষ্ট লক্ষণ ছিল। তবে তাদের সবার সংক্রমণই ‘মৃদু’ বলে মন্তব্য করেন ফ্লোরা। এর আগে দ্বিতীয় দফায় ইতালি ও জার্মানি ফেরত যে দু’জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়ে,

তাদেরই একজনের মাধ্যমে তার পরিবারের ওই তিন সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। ওই তিনজনকে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।অধ্যাপক ফ্লোরা বলেন, আক্রান্তদের মাধ্যমে অন্য কারও শরীরে যেন ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য তাদের আইসোলেশন ইউনিটে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। অন্যান্য দেশের মতো তাদেরও বাড়িতে রেখে চিকিৎসা করা যেত, কিন্তু আমরা তা করছি না। এ নিয়ে বাংলাদেশে আটজনের মধ্যে এ ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ল।

যাদের মধ্যে প্রথম দফায় আক্রান্ত তিনজন এরই মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন পাঁচজন।স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, সোমবার পর্যন্ত বিদেশ ফেরত সন্দেহজনক ৩ হাজার ৪৮৮ জনকে হোম কেয়ারেন্টিনে নেয়া হয়েছে। রোববার এই সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৪৭১ জন। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে কেয়ারেন্টিনে থাকার সংখ্যা বেড়েছে ১ হাজার ১৭ জন।কোয়ারেন্টিনে থাকার এই পরিসংখ্যান ১০ মার্চ থেকে শুরু করেছে সরকার।

বর্তমানে সবচেয়ে বেশি কোয়ারেন্টিন রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে ১ হাজার ৩৪৩ জন। এর পরেই ঢাকা বিভাগে রয়েছে ১ হাজার ২০৯ জন।
রাজশাহীতে ৪১৯, খুলনায় ৩২৬, বরিশালে ৫০, ময়মনসিংহে ৪২, রংপুরে ৩২ এবং সিলেটে ৬৪ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হোম কোয়ারেন্টিনে রয়েছেন মানিকগঞ্জ জেলায় ২৯৬ জন। সেখানে ২৪ ঘণ্টায় (রোববার বিকাল থেকে সোমবার বিকাল পর্যন্ত) ৪৯ জনকে হোম কোয়ারেন্টিন করা হয়েছে।

পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্যসেবা অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, যে এলাকা বা উপজেলা থেকে সংক্রমণটি স্থানীয়ভাবে ছড়াতে শুরু করেছে, সেই এলাকাটি লকডাউন করার বিষয়ে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। তারা জানান, কর্তৃপক্ষ মনে করছে, কোনো এলাকায় যদি ১০ জন বা তার বেশি মানুষ স্থানীয়ভাবে সংক্রমিত হয়, তাহলে এলাকাটি লকডাউন করা হবে।

অন্যথায় স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় কঠোর নজরদারিতে রাখা হবে।পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভাইরোলজি বিশেষজ্ঞ যুগান্তরকে জানান, স্থানীয়ভাবে ছড়ানোর বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য সতর্কসংকেত। এ ধরনের ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি পিরামিড তৈরি করে। অর্থাৎ সংক্রমণ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে এটি সর্বোচ্চ সংক্রমণে পৌঁছায়। তারপর ধীরে ধীরে সংক্রমণের হার নিচে নামতে শুরু করে।

অর্থাৎ প্রথমে বাংলাদেশে যে সংক্রমিত রোগী শনাক্ত হয়, তারা ছিল বিদেশ ফেরত। এরপর স্থানীয়ভাবে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মেলে। বর্তমানে স্থানীয়ভাবে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। এরপর অন্যান্য দেশের মতো এটি জ্যামিতিক হারে ছড়াতে শুরু করবে।আইইডিসিআর পরিচালক জানান, আক্রান্তরা যে উপজেলার বাসিন্দা, সেখান থেকে যেন রোগটি ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য ওই জায়গার ওপর কঠোর নজরদারি রাখা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ মুহূর্তে যারা হোম কোয়ারেন্টিনে রয়েছেন, তাদের জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে যেতে হলে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসনের অনুমতি নিতে হবে। যারা বিদেশ থেকে এসে পরিবারের সঙ্গে থাকছেন, তাদের পরিবারের সদস্যদেরই কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করতে হবে।যদি কেউ হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার বিষয়টি না মেনে অবাধ ঘোরাফেরা করেন,

তবে তাদের বিরুদ্ধে সংক্রামক ব্যাধি আইন প্রয়োগ করা হবে। এক্ষেত্রে আর্থিক জরিমানার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলেও জানান অধ্যাপক ফ্লোরা। তিনি বলেন, করোনাভাইরাস অতি দ্রুত ছড়ালেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর সংক্রমণ খুব মৃদু হয়ে থাকে। আমরা বিভিন্ন দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। তারা মৃদু রোগে ভুগছেন। তাদের মৃদু কাশি, গলাব্যথা, মৃদু জ্বরের লক্ষণ প্রকাশ পায়। আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি সতর্কতায়। সবার অংশগ্রহণ ছাড়া এ রোগকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।