নবীজির বিরহে কান্না করে খেজুরগাছ

মহানবী (সা.) মদিনায় মসজিদে নববীতে খুতবা দেওয়ার সময় একটি খেজুরগাছের খুঁটিতে হেলান দিতেন। একে উস্তুনে হান্নানা বলা হয়। উস্তুন ফারসি শব্দ, এর আরবি হলো উস্তুয়ানা। অর্থ—খুঁটি। আর হান্নানা অর্থ ক্রন্দসী বা কান্নারত।যখন মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, তখন দূরের মুসল্লিদের মহানবী (সা.)-কে দেখতে অসুবিধা হয় এবং শুনতে পান না তাঁর কথা। ফলে উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে খুতবা দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। মহানবী (সা.)-এর মিম্বর : সহিহ বুখারি শরিফের ‘মিম্বরে দাঁড়িয়ে খুতবা দান’ অধ্যায়ে কুতাইবা ইবনু সাইদ (রহ.)-হজরত আবু হাজেম ইবনে দিনার থেকে বর্ণনা করেন,

রাসুলুল্লাহ (সা.) আনসারদের জনৈক নারীর কাছে লোক পাঠিয়ে বলেন, তোমার কাঠমিস্ত্রি গোলামকে আমার জন্য কিছু কাঠ দিয়ে এমন জিনিস তৈরি করার নির্দেশ দাও, যার ওপর বসে আমি লোকদের সঙ্গে কথা বলতে পারি। অতঃপর সে নারী মদিনা থেকে ৯ মাইল দূরে গাবা নামক স্থানের ঝাউ কাঠ দিয়ে তা তৈরিকরে নিয়ে আসে। অতঃপর মহানবী (সা.)-এর নিকট তা পাঠিয়ে দেয়। মহানবী (সা.)-এর আদেশে এখানেই তা স্থাপন করা হয়।মহানবী (সা.) এর ওপর নামাজ আদায় করেছেন,

এর ওপর তাকবির দিয়েছেন এবং এর ওপর দাঁড়িয়ে রুকু করেছেন।তারপর পেছনের দিকে নেমে এসে মিম্বরের গোড়ায় সিজদা করেছেন এবং এ সিজদা পুনরায় করেছেন। অতঃপর নামাজ শেষ করে সমবেত লোকদের দিকে ফিরে বলেছেন, হে লোকসকল! আমি এটা এ জন্য তৈরি করেছি যাতে তোমরা আমার অনুসরণ করতে পারো এবং আমার থেকে নামাজ শিখে নিতে পারো। (বুখারি, হাদিস : ৯১৭) মহানবী (সা.) বলেছেন, আমার ঘর ও মিম্বরের মাঝে রয়েছে জান্নাতের বাগিচা (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, মিশকাত-৬৯৪)।

এ জায়গাকে জান্নাতের বাগিচা বলার কারণ প্রসঙ্গে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। আল্লামা তুরপুসতি বলেন, এ জায়গা বরকতময় বলে একে বাগিচা বলা হয়েছে। কেননা রওজা জিয়ারতকারী ও মসজিদে ইবাদতকারী ফেরেশতা ও মানব-দানব সদা এ জায়গায় আল্লাহর জিকির ও ইবাদতে মগ্ন থাকেন। এক দল চলে যাওয়ার পর আরেক দল আসে। জিকিরের জায়গাই জান্নাতের বাগিচা। ইমাম মালেক (রহ.) বলেন, জায়গাটি জান্নাত থেকে এনে এখানে স্থাপন করা হয়েছে, তাই একে জান্নাতের অংশ বলা হয়েছে।

খুঁটির ক্রন্দন : সাইদ ইবনে আবু মারয়াম (রহ.) জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণনা করেন, মসজিদে নববীতে একটি খেজুরগাছের খুঁটি ছিল। মিম্বর তৈরির আগে মহানবী (সা.) তাতে হেলান দিয়ে (খুতবা দেওয়ার জন্য দাঁড়াতেন)। অতঃপর যখন তাঁর জন্য মিম্বর তৈরি করা হয়, তখন তিনি খুঁটিটি বর্জন করে মিম্বরে দাঁড়িয়ে খুতবা দেন এবং আলোচনা করেন। [প্রিয় নবী (সা.)-এর বিরহে] আমরা তখন খুঁটি থেকে ১০ মাসের গর্ভবতী উষ্ট্রীর মতো ক্রন্দন করার শব্দ শুনতে পেলাম। এমনকি মহানবী (সা.) মিম্বর থেকে নেমে এসে খুঁটির ওপর হাত রাখেন। অতঃপর খুঁটির কান্না বন্ধ হয়। (সহিহ বুখারি, জুমা অধ্যায়, হাদিস নম্বর : ৯১৬)

আল্লামা রুমি (রহ.) তাঁর সুবিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ মসনবি শরিফে এ ঘটনাকে তাঁর দর্শনের পক্ষে যুক্তি হিসেবে পেশ করেছেন যে জড়-অজড় সব পদার্থ জীবিত, এদের প্রাণ আছে। নিজের ভাষায় এরা কথা বলে। আল্লাহর সঙ্গে রয়েছে এদের সংযোগ। আমাদের সেই কান নেই, তাই শুনতে পাই না এদের কথা। আমাদের সেই জ্ঞান নেই, তাই বুঝি না তাদের ভাষা। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘সপ্ত আকাশ ও পৃথিবী এবং এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে সব কিছু তাঁরই পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে।

এবং এমন কিছু নেই, যা তাঁর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে না। কিন্তু তাদের পবিত্রতা, মহিমা ঘোষণা তোমরা অনুধাবন করতে পারো না। নিশ্চয়ই তিনি অতি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৪৪) খুঁটির শেষ অবস্থা : মহানবী (সা.) সেই খুঁটিটিকে মসজিদে নববীতে দাফন করেন। তার ওপরই বর্তমানে রাসুলে পাকের মিম্বর দাঁড়িয়ে আছে।