করোনা গুজবে সংসার ভাঙতে বসেছিল প্রবাসীর

করোনা ভাইরাসের ভয়ে কাঁপছে পুরো বিশ্ব। চীনের উহান যেন এক মৃত্যুপুরী। দিনে শতাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে হাজারো মানুষ। চীনের গণ্ডি পেরিয়ে ভয়াবহ এই ভাইরাস ছড়াচ্ছে দেশে দেশে। দ্বীপ দেশ সিঙ্গাপুরে পাঁচ বাংলাদেশির শরীরে ধরা পড়েছে এই ভাইরাস। করোনা আতঙ্কের মধ্যে চীন সিঙ্গাপুরসহ আশপাশের দেশ থেকে প্রবাসী বাংলাদেশীদের কেউ কেউ ফিরে আসছেন।

দেশে ফিরে বিমানবন্দরে স্ক্রিনিং হয়ে আসা এসব প্রবাসীরা নিজ নিজ এলাকায় নানা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন। তাদের ঘিরে ছড়ানো হচ্ছে নানা গুজব। এমন এক ঘটনায় টাঙ্গাইলের বাসাইলে সংসার ভেঙে যেতে বসেছিলো এক প্রবাসীর। তিনি সম্প্রতি সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফিরেন। এলাকায় গুজব ছড়ানো হয় তিনি করোনা আক্রান্ত। এ কারণে তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেছেন। এমন গুজব আর গুঞ্জনের অবশ্য সমাপ্তি হয় প্রবাসী আব্বাস আলীর স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর।

সিঙ্গাপুর ফেরত প্রবাসী আব্বাস আলীর বাড়ি উপজেলার কাশীল ইউপি’র দেউলী মধ্যপাড়ায়। সোমবার দুপুরে মানবজমিন প্রতিনিধির সঙ্গে আব্বাস ও তার স্ত্রী-সন্তান, মা, ভাই-ভাবীর সাথে কথা হয়। আব্বাস বলেন, ১৩ই ফেব্রুয়ারি আমি বাংলাদেশ আসি। এয়ারপোর্টে আমাদের সর্বোচ্চ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। করোনা ভাইরাসের কোন নমুনা ধরা না পড়ার কারণে কর্তৃপক্ষ আমাকে চলে আসার অনুমতি দেন।

বাড়িতে আসার পরের দিন বাজারে গেলে পাড়ার কিছু লোকজন আমাকে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের মিথ্যা অভিযোগ দেয় এবং গুজব ছড়াতে থাকে। ১৬ই ফেব্রুয়ারী বাসাইল উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গাড়ি এসে আমাকে বাসাইল হাসপাতালে ও পরে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে করোনা ভাইরাসের কোন লক্ষণ ধরা না পরায় আমি বাড়িতে চলে আসি। আব্বাসের স্ত্রী মাকসুদা আক্তার বলেন,

আমার স্বামী সিঙ্গাপুর থেকে ফেরার পরই ওই লোকেরা আমাদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা বাজারে আমার স্বামীকে জড়িয়ে করোনা ভাইরাসের গল্প তৈরি করে এলাকায় ভীতি ছড়াচ্ছে। অথচ আমি আমার স্বামীর সাথে সুখেই সংসার করছি। অথচ পত্রপত্রিকা ও বিভিন্ন মিডিয়ার মিথ্যা সংবাদ দেখে সিঙ্গাপুুর থেকে আমার ও আমার স্বামীর আত্মীয় স্বজনরা জিজ্ঞেস করছে-আমি স্বামীর সংসার ছেড়ে কেন চলে এসেছি।

বাসাইল উপজেলা নিবার্হী কর্মকতা শামছুননাহার স্বপ্না বলেন, করোনা ভাইরাসের একটা আতঙ্ক ছড়ানোয় তাকে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে পরীক্ষা করানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে তারা জানিয়েছেন, আব্বাস আলীর করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত কোন সমস্যা নেই। তবে আরো ভাল ভাবে টেষ্টের জন্য তাকে ঢাকায় যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কাশীল ইউপি চেয়ারম্যান মির্জা রাজিক বলেন,

এলাকায় গুজব শুনে প্রশাসনের মাধ্যমে তাকে পরীক্ষা করানো হয়েছে। টাঙ্গাইলের সিভিল সার্জন ডা. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, সিঙ্গাপুুর থেকে ফেরার সময় এয়ারপোর্টের পরীক্ষায় তার শরীরে করোনা ভাইরাসের কোন লক্ষণ পাওয়া যায়নি। বিমান বন্দরের স্ক্যানারেও তার জ্বরের কোন লক্ষণ মেলেনি। এলাকাবাসীর উদ্বেগের জন্যই এমনটা হয়েছে। এদিকে, হবিগঞ্জে চীন ফেরৎ এমন এক রোগীকে নিয়ে তুলকালাম ঘটনা ঘটে।

চীনের মেডিকেলে পড়া ওই শিক্ষার্থী দেশে ফিরে অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে নেয়া হয়। চিকিৎসকরা তাকে ভর্তির পরামর্শ দিলে তিনি ভয়ে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যান। দ্বিতীয় দফায় পুলিশের মাধ্যমে তাকে হাসপাতালে ডেকে এনে ভর্তি করা হয়। ওই রোগীকে নিয়েও এলাকায় নানা গুজব-গুঞ্জন চলছে। যদিও স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, পরীক্ষায় এ পর্যন্ত তার শরীরে করোনা সংক্রমণের কোন তথ্য যাওয়া যায়নি।

এদিকে, চীন ও সিঙ্গাপুর ফেরত অনেককে নিয়ে এমন আতঙ্ক দেখা দেয়ার প্রেক্ষিতে সরকারের রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর গতকাল জানিয়েছে, চীন বা সিঙ্গাপুর থেকে কেউ ফিরলে কেউ করোনা আক্রান্ত এটি বলা যাবে না। যারা ফিরছে তাদের পরীক্ষা করেই দেশে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে। এ নিয়ে গুজব আতঙ্ক ছড়ানোর কিছু নেই। প্রবাস ফেরৎ এমন

ব্যক্তিদের কারও কারও ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ নিজস্ব উদ্যোগে খোঁজ খবর নিচ্ছে এমন তথ্য এসেছে জানিয়ে আইইডিসিআর জানিয়েছে, এ ধরণের কোন উদ্যোগ নেয়ার প্রয়োজন নেই। সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ সংক্রান্ত কাজ সমন্বয় করছে। প্রয়োজন হলে অধিদপ্তরই নির্দেশনা দেবে। প্রয়োজন ছাড়া এমনটি করলে মানুষ আরও বেশি আতঙ্কিত হবে।