সম্রাটকে এখন চিনেন না আওয়ামী লীগ নেতা সেলিম খান ।

সম্রাটকে এখন চিনেন না আওয়ামী লীগ নেতা সেলিম খান ।

চাঁদপুর সদরের ১০নং লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সেলিম খান। ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি। এক সময় রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এখন প্রাডো ও র‌্যাভ-৪ জিপে চলাফেরা করেন। আছে বিশাল ‘হুন্ডা বাহিনী’। যাপন করেন বিলাসী জীবন। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর পর কয়েক দিন ছিলেন আত্মগোপনে।চাঁদপুর শহরের কালীবাড়ির কাছে লাভলী স্টোরের জমি ২১ কোটি টাকা দিয়ে কিনেছেন বলে জানা গেছে।

শুধু চাঁদপুর নয়, ক্যাসিনোর গডফাদার ইসমাইল হোসেন সম্রাটের সহযোগী হিসেবে ঢাকায়ও সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন তিনি। সিনেমায় বিনিয়োগ রয়েছে কয়েক কোটি টাকা। তিনি ঢাকায় নিজের সাম্রাজ্য ধরে রাখতে সম্রাট, খালেদ, আরমান ও সাঈদ কমিশনারের সঙ্গে যোগ দিয়ে সিনেমার ব্যবসায় টাকা লগ্নি করেন। তার নিজের প্রতিষ্ঠানের নাম শাপলা মিডিয়া।

আমি নেতা হব, চিটাগাইঙ্গা পোলা নোয়া খাইল্যা মাইয়া, ক্যাপ্টেন খান, শাহেনশাহ, প্রেম চোর, একটা প্রেম দরকার ও বিক্ষোভ ছবি সেলিম খানের টাকায় বানানো। তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগ ছবির নায়ক সুপারস্টার শাকিব খান।এছাড়া ক্যাসিনো কেলেঙ্কারিতে আটক আরমানের প্রযোজিত দুটি ছবির নায়কও শাকিব খান। যার একটির (আগুন) শুটিং চলমান রয়েছে।

জানা গেছে, সেলিম খান ৭টি ছবির পেছনে কমপক্ষে ২৫ কোটি টাকা লগ্নি করেছেন। তবে সিনেমা সংশ্লিষ্টদের মতে, টাকার পরিমাণ আরো অনেক বেশি। জানা গেছে, সেলিম খান আত্মগোপন থেকে ফের প্রকাশ্যে এসেছেন। তার দাপটে চাঁদপুরের মানুষ তটস্থ। কেউ তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পায় না। ফলে তার সব অপকর্ম ঢাকা পড়ে আছে। তবে ভুক্তভোগীসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ কৌশলে তার ফুলেফেঁপে ওঠার গল্প গণমাধ্যমে জানাচ্ছেন।

কয়েক বছরের ব্যবধানে সেলিম খানের অস্বাভাবিক সম্পদ এলাকাবাসীর কাছে রূপকথার গল্পের মতো।গত দশ বছরে রিকশাচালক থেকে কীভাবে অঢেল সম্পদের মালিক হলেন- এ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে তিনি গণমাধ্যমে বলেন, আমি চাঁদপুরের একটি স্থানীয় দৈনিকের সম্পাদক ও প্রকাশক। ‘আমি একজন সম্মানীয় ব্যক্তি’। ৯ বছর একটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। পত্রিকার সম্পাদক- প্রকাশক হতে হলে লেখাপড়া থাকতে হয়- এমন প্রশ্ন শুনে তিনি উত্তেজিত হয়ে মামলা করারও হুমকি দেন।

ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ ব্যবহার এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নদী থেকে বালু উত্তোলনের কাজটি করছেন। এসব কাজে তার বিশাল বাহিনী ব্যবহার করে থাকেন। ফলে চাঁদপুরের নদীতীরবর্তী এলাকা ভাঙনের মুখে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড নিয়ন্ত্রিত বেড়িবাঁধ খাল দখল করে মাছ চাষ করছেন।শাপলা মাল্টি মিডিয়া নামে একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান খুলে সিনেমায় কালো টাকা বিনিয়োগ করেছেন।

ঢাকার ক্যাসিনো ব্যবসাসহ তদবির বাণিজ্য করে তিনি এখন টাকার কুমির।সরেজমিন তার সম্পদ অর্জনের অনেক অজানা কাহিনী জানা গেছে। এলাকার লোকজন জানান তিনি ফসলি জমি ভরাটের মাধ্যমে নষ্ট করছেন কৃষিজমি। মেঘনা নদী থেকে বছরের পর বছর বালু উত্তোলন করে চলেছেন।নদীতে শত শত ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু তুলে বিক্রি করছেন। এর ফলে নদীভাঙন বাড়ছে। ঝুঁকির মুখে পড়েছে চাঁদপুর-হাইমচর রক্ষাবাঁধ।

তবে তিনি অবৈধভাবে ব্যবসার কথা অস্বীকার করে সেলিম খান বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে অনুমতি নিয়ে বালু উত্তোলন করি।’ এলাকাবাসী বলেন, চেয়ারম্যানের নিজের ইউনিয়নটি নদীর পাড়ে। সেখানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা বলে গরিব দুঃখীদের ফসলি জমি ও ভিটেবাড়ি নামমাত্র মূল্যে গ্রাস করে নিচ্ছেন। চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা বলে যাদের জমি নিয়েছেন তাদের মধ্যে স্থানীয় সুকা কবিরাজের বাড়িসহ প্রায় ২৫টি বাড়ির শতাধিক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।

যে জমির শতাংশ এক লাখ টাকা সে জমি তিনি ৫-১০ হাজার টাকায় নিচ্ছেন। তিনি চাইলে জমি দিতেই হবে। না দিলে পরিণতি হবে ভয়াবহ। অপরদিকে সম্রাটের সঙ্গে যোগ দিয়ে ঢাকা এবং আশপাশে নামে-বেনামে বিশাল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। সম্রাট ছাড়াও যুবলীগের খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, আরমান, ওয়ার্ড কাউন্সিলর সাঈদসহ এ চক্রটির সঙ্গে মিলেমিশে নিজেকে অন্য প্রভাবশালীদের তালিকায় নিয়ে যান। নিজের মুখেই স্বীকার করেছেন কাকরাইলে তার চার তলা আলিশান বাড়ি রয়েছে।

এছাড়া ডেমরায় তার ৬ তলা বাড়ি, নারায়ণগঞ্জের ভুইগড়, রাজধানীর হাতিরপুলসহ বিভিন্ন স্থানে বেনামি সম্পদ রয়েছে বলে জানা গেছে। সেলিম খানের বিষয়ে জানতে চাইলে বর্তমান লক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন ও সাবেক সাখুয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান খান ওরফে মনা খাঁ বলেন, আমি যতটুকু জানি তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে তা সঠিক। তিনি এক সময় রিকশা চালাতেন। তার বিশাল বিত্তবৈভব নিয়ে আমাদের সবার মাঝে প্রশ্ন আছে।

কীভাবে এত সম্পদের মালিক হয়েছেন, তা এলাকার মানুষের কাছে বিস্ময়।শত শত কোটি টাকার সম্পদের উৎস কী- জানতে চাইলে ১০নং লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়ন চেয়ারম্যান সেলিম খান বলেন, সম্পদ বলতে কাকরাইলে ঈশা খাঁ হোটেলের পাশে চার তলা একটি বাড়ি ছাড়া আমার আর কিছুই নাই। অন্য যেসব সম্পদের কথা বলা হচ্ছে তা ঠিক নয়।

কীভাবে রিকশাচালক থেকে কোটি কোটি টাকার মালিক হলেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, রিকশা চালানোর তথ্যের কোনো ভিত্তি নেই। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর পর অস্ত্র থানায় জমা দেয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার বাড়ি ভেঙে যাওয়ায় অস্ত্র জমা দিয়েছি। কথার এক পর্যায়ে ক্যাসিনো তালিকায় নাম রয়েছে জানালে তিনি ভড়কে যান। তিনি সম্রাটের সঙ্গে যোগসাজশের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, আমি সম্রাটকে চিনি না।

এদিকে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের বিপুল সম্পদের বর্ণনা শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, চেয়ারম্যান সেলিমের সম্পদের বিবরণ শুনে মনে হয়েছে বড় ধরনের অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ-সম্পদ আহরণের একটি দৃষ্টান্ত। এটা পরিষ্কারভাবে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে দুর্নীতি। তদন্তের বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের এখতিয়ার হয়ে যায়। কাজেই আমরা আশা করব, তার ব্যাপারে সঠিক তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন




© All rights reserved © 2019 newstodaybd.com
Design BY NewsTheme
[X]