তুমি ফিরে এসো খোকা, আমি অপেক্ষায় থাকব: মির্জা আব্বাস

তুমি ফিরে এসো খোকা, আমি অপেক্ষায় থাকব: মির্জা আব্বাস

ঢাকার রাজনীতিতে মির্জা আব্বাস ও সাদেক হোসেন খোকার বৈরিতা কারো অজানা নয়। যুগ যুগ ধরে চলে আসছে এই দ্বন্দ্ব। এই দুজনকে ঘিরে বিএনপিতে তৈরি হয়েছে দুটি বলয়। কোনো পক্ষ কাউকে ছাড় দেয়ার নয়। এই বিরোধ মিটমাট করতে বিএনপির হাইকমান্ডকে বেশ কয়েকবার গলদঘর্ম হতে হয়েছে।

তবে রাজনৈতিক ‘চিরশত্রু’ সাদেক হোসেন খোকার অবস্থা সংকটাপন্ন শুনে ভেঙে পড়েছেন মির্জা আব্বাস। কয়েক যুগের শত্রুতা ভুলে খোকার পাশে দাঁড়িয়েছেন মির্জা আব্বাস। তার সুস্থতা কামনায় একটি আবেগঘন খোলা চিঠি লিখেছেন। সেটি নিজের ফেসবুক ওয়ালে দিয়েছেন মির্জা আব্বাস।

এই চিঠি হৃদয় ছুঁয়ে গেছে বিএনপির নিযুত নেতাকর্মীদের। খোলা চিঠিতে মির্জা আব্বাস লিখেছেন, সুস্থ হয়ে ফিরে এসো খোকা, ফিরো এসো। আমি তোমার অপেক্ষায় থাকব। চিঠিতে অসুস্থ খোকার প্রতি সহমর্মিতা জানানোর পাশাপাশি তাদের মধ্যকার রাজনৈতিক বিরোধের কথাও উল্লেখ করেছেন মির্জা আব্বাস।

আবার একসঙ্গে পথচলার আশাও করেছেন। মির্জা আব্বাস লিখেছেন, ‘প্রিয় খোকা, এই মাত্র আমি খবর পেলাম যে, তোমার শরীর খুব খারাপ। তুমি হাসপাতালে শয্যাশায়ী। জানার পর থেকে আমার মানসিক অবস্থা যে কতটা খারাপ, এই কথাটুকু কারও সঙ্গে শেয়ার করব, সেই মানুষটা পর্যন্ত আমার নেই।

তুমি-আমি একসঙ্গে রাজনীতি করেছি, অনেক স্মৃতি আমার চোখের সামনে এই মুহূর্তে ভাসছে।’ স্বার্থান্বেষীরা তাদের মধ্যে বিরোধ জিইয়ে রেখেছে উল্লেখ করে মির্জা আব্বাস লিখেছেন, ‘তোমার আর আমার দীর্ঘ এই পথচলায় কেউ কেউ তাদের ব্যক্তি স্বার্থে তোমার আর আমার মাঝে একটা দূরত্ব তৈরি করে রেখেছিল। তবে তুমি আর আমি কেউই সেই দূরত্বে রয়েছি বলে আমি কখনোই মনে করিনি।’

খোকার দু:সময়ে পাশে না থাকতে পারার আক্ষেপ প্রকাশ করে মির্জা আব্বাস লিখেছেন, ‘আমি জানি না, তোমার সঙ্গে আমার আর দেখা হবে কি না? আমার এই লিখাটি তোমার চোখে পড়বে কি না বা তুমি দেখবে কি না, তাও আমি জানি না। তবে বিশ্বাস কর, তোমার শারীরিক অসুস্থতার কথা জানবার পর থেকেই বুকের ভেতরটা কেন যেন ভেঙে আসছে।’

খোকার সুস্থতার কামনা করে আব্বাস লিখেছেন, ‘আমি বার বার অশ্রুসিক্ত হচ্ছি। মহান আল্লাহ তালার কাছে দুহাত তুলে তোমার জন্য এই বিশ্বাস নিয়ে দোয়া করছি- তিনি অবশ্যই তোমাকে সুস্থ করে আমাদের মাঝে ফিরে আনবেন।’ আবার একসঙ্গে পথচলার আশাবাদ ব্যক্ত করে আব্বাস লিখেছেন, ‘তুমি আর আমি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, বুকে বুক মিলিয়ে রাজনীতির মাঠে কাজ করে যাব।

না হয় সেই আগের মতোই স্বার্থপর কোনো মানুষদের জন্য আব্বাস আর খোকা বাইরে বাইরে দূরত্বের সেই অভিনয়টা করে যাবে, আর ভেতরে থাকবে দুজনের প্রতি দুজনের অন্তর নিংড়ানো ভালোবাসা।’ ‘আল্লাহ তোমার সুস্থতা দান করুক। তুমে ফিরে এসো খোকা, তুমি ফিরে এসো। আমি অপেক্ষায় থাকব’-যোগ করেন আব্বাস।

মির্জা আব্বাস একসময় ঢাকা মহানগর বিএনপির সভাপতি ছিলেন, পরে সেই স্থানে আসেন খোকা। এরপর আবারও মির্জা আব্বাসকে ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক করা হয়। ঢাকার এক সময়ের মেয়র ছিলেন মির্জা আব্বাস, পরে খোকাও মেয়র হন। মির্জা আব্বাস বিএননি ক্ষমতায় থাকাকালে একাধিকবার মন্ত্রী হন।

খোকাও ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিএনপি সরকারের মন্ত্রিত্ব পান। মির্জা আব্বাস এখন বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে রয়েছেন। অন্যদিকে ভাইস চেয়ারম্যান খোকা নানা মামলা ও দণ্ড মাথায় নিয়ে কয়েক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর পর আর দেশে ফেরেননি। যুক্তরাষ্ট্রে ক্যান্সারের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন খোকা; এখন তার অবস্থা গুরুতর বলে খবর এসেছে। আর তা শুনেই মির্জা আব্বাসের এই চিঠি।

ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য ২০১৪ সালের ১৪ মে সপরিবারে নিউইয়র্ক চলে যান সাদেক হোসেন খোকা। তারপর থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিউইয়র্ক সিটির কুইন্সে একটি বাসায় দীর্ঘদিন ধরে থাকছেন বিএনপির এই নেতা। যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির একাধিক নেতা জানান, সাদেক হোসেন খোকা দীর্ঘদিন ধরে কিডনির নানা সমস্যায় ভুগছিলেন।

প্রায় তিন সপ্তাহ আগে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে স্লোয়ান ক্যাটারিং ক্যানসার সেন্টারে ভর্তি করা হয় খোকাকে। সোমবার স্বাস্থ্যের আরও অবনতি ঘটলে তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়। স্লোয়ান ক্যাটারিং ক্যান্সার সেন্টারে ভর্তি হওয়ার পর ২৭ অক্টোবর সাদেক হোসেন খোকার শ্বাসনালি থেকে টিউমার অপসারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে তার পরিবার। এরপর থেকে তিনি খুবই অসুস্থ।

সূত্র জানায়, লাগাতার ওষুধ সেবনের ফলে খোকার মুখে ঘা হয়ে গেছে। তিনি খাবার খেতে পারছিলেন না। পরে তার শ্বাসনালীতে অস্ত্রোপচার করা হয়। এরপর তাকে চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে হাসপাতালেই। খোকার গুরুতর অসুস্থতার কথা জানিয়ে বুধবার দুপুরে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন,

‘আমাদের দলের ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা ক্যান্সারে আক্রান্ত। তিনি মুমূর্ষু অবস্থায় আছেন। তিনি আমাকে অনুরোধ করেছেন, দেশবাসীর কাছে তার জন্য দোয়া চাইতে। তার এ অনুরোধটি আপনাদের জানাতে বলেছেন।’ এদিকে গুরুতর অসুস্থ খোকা দেশে ফিরতে চান। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সঙ্গে টেলিফোন আলাপে দেশে ফেরার আকুতির কথা জানান এই মুক্তিযোদ্ধা।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিএনপির চেয়ারপাসনের মিডিয়া উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান। শায়রুল বলেন, হাসপাতালে যাওয়ার আগে সাদেক হোসেন খোকা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে আক্ষেপ করে বলেছেন, জীবনবাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। দেশের মাটিতে বিদায় হবে কিনা আল্লাহ জানেন। আমার জন্য দোয়া করো। পরিবারের পক্ষ থেকে দেশবাসীর কাছে দোয়া চাওয়া হয়েছে জানিয়ে শায়রুল কবির খান বলেন, সাদেক হোসেন খোকার সুস্থতা কামনা করে বিএনপির নানা স্তরে দোয়া মাহফিল আয়োজন করা হচ্ছে। তার পরিবার দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন




© All rights reserved © 2019 newstodaybd.com
Design BY NewsTheme
[X]